স্টাফ রিপোর্টার :
ভোটারদের আস্থার সংকটে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয়সহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা স্বয়ং কমিশনের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। আস্থার সংকট জেনেও তা অর্জনের চেষ্টা করেনি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে বিগত তিনটি ত্রুটিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের পর ভোটের প্রতি এক ধরনের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। প্রতি বছর ভোটার বাড়লেও ভোটের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ তৈরি হয়নি। তবে এই পরিস্থিতির জন্য যতটা না রাজনীতি জড়িত, তার চেয়ে ইসির কর্মকাণ্ডও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন নির্বাচনে অনিয়ম হলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ইসি। বরং যেসব নির্বাচনে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সেসব জায়গায় কঠোর হতে দেখা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গাছাড়া ভাব দেখা যায়। ভোটার দিবসের আলোচনাসভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ভোটারের বিষয় যখন হয় তখন প্রতিনিধিত্বের বিষয় আসে। নির্বাচন করতে গেলে ভোটারের প্রয়োজন হয়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে একটা বড় দল আসেনি। তাই অনেক ভোটার না এসে থাকতে পারে। ইসির সংশ্লিষ্টরা বলেন, ২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী হাবিবুল আউয়ালকে নির্বাচন কমিশনের প্রধান করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়। ঐ গেজেটে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহসান হাবীব খান, সাবেক জেলা ও দায়রা জজ বেগম রাশেদা সুলতানা, সাবেক সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর ও সাবেক সিনিয়র সচিব আনিছুর রহমান। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন নতুন ইসি। তার আগে ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদায় নেন আলোচিত-সমালোচিত কেএম নূরুল হুদা কমিশন। বিগত কমিশনের মেয়াদে অনুষ্ঠিত নির্বাচন এবং এতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ছিল। এছাড়াও নিজেদের মধ্যে মনোমালিন্যসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতার সংকটে ফেলে। পুরোনো ভোটারদের স্মার্টকার্ড দিতে না পারা, এনআইডি অনুবিভাগ নিজেদের কাছে রাখতে জোরাল ভূমিকা না রাখা, ইভিএমে ভোটগ্রহণ, ভোটে নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নগ্ন হস্তক্ষেপ, সরকার দলীয় প্রার্থীদের একক প্রভাব, ভোটারদের অনীহা, বিনাভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া, কেন্দ্রে সহিংসতার পাশাপাশি ব্যাপক প্রাণহানি রুখতে না পারা বিগত ১০ বছরের ব্যর্থতা ছিল ইসির ঘাড়ে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় কাজী রকিবউদ্দিন কমিশন ও সর্বশেষ কে এম নূরুল হুদা কমিশনের রেখে যাওয়া সংকট নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনকে। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হতে পারেনি কমিশন। আগের ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায় বর্তমান কমিশনেও। বিশেষ করে গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের হার, বিএনপিসহ ১৬টি দলের নির্বাচন বর্জনের ফলে নির্বাচনটি বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত বছরের ১৭ জুলাই বরিশাল অঞ্চলে অনুষ্ঠিত একটি বহুল আলোচিত পৌরসভা নির্বাচনে ইসির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ছিল। ঐ পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের সামনেই তার কার্যালয়ে ঢাকা থেকে আহত সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই স্থানীয় এক জন সাংবাদিককে পিটিয়ে উপজেলা চত্বরে টাঙানোর হুমকি দেন উপজেলা চেয়ারম্যান। নির্বাচনি ভীতিসন্ত্রস্ত পরিবেশ তৈরি করেন। ভোটের আগের দিন রাতে সংঘটিত অপ্রীতিকর ঘটনায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি ইসি। ভোটের পর রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে ঘটনার প্রতিবেদন উপস্থাপনের নির্দেশ দেয় ইসি। রিটার্নিং অফিসারের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং ঐ উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে চিঠি দেয় ইসি। ঐ চিঠি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল ইসির কার্যক্রম। ভোটের আগের রাতের ঘটনা কেন ভোটের পরে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছিল ইসি, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। স্থানীয়রা জানান, ইসির কর্তাব্যক্তিদের প্রভাবশালী একটি পক্ষের প্রতি দুর্বলতা ছিল। এছাড়াও ভোটের আগের রাতে দুর্বৃত্তরা পাঁচটি সিসি ক্যামেরা তার কর্তন করলেও তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ইসি নীরব ভূমিকা পালন করে প্রকৃতপক্ষে প্রতিপক্ষকে সুবিধা দিয়েছে। একইভাবে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে বর্তমান কমিশনের বিরুদ্ধে। সীমানা পুনর্র্নিধারণের ক্ষেত্রে কমিশন বরাবরই বলেছিল, এবার সীমানায় পরিবর্তন হবে না। কিন্তু চূড়ান্ত সীমানার গেজেটে একটি আসনকে টার্গেট করে ঐ আসনটি তছনছ করে দেওয়া হয়। পুরো সীমানা উলটপালট করে দেয় ইসি। ভোটের আগমুহূর্তে ইসির এই তুঘলকি সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা। ইসির সিদ্ধান্ত কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না—এমন সাংবিধানিক ব্যাখ্যার সুযোগ নিয়ে আসন কর্তন সংবিধানসম্মত নয় বলে মনে করেন আইনবিশেষজ্ঞরা। ভোটার বেড়েছে, কমেছে ভোট: নবম সংসদ নির্বাচনে (২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর) দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮৭.১৩ শতাংশ ভোট পড়ে। ঐ সময় দেশে ভোটার ছিলেন ৮ কোটি ১০ লাখ। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ছিল একতরফা। ভোটের আগেই ঐ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা। সে নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৩৯ শতাংশ। ভোটার ছিল ৯ কোটি ২০ লাখ। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি সমালোচিত নির্বাচন। ঐ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ। ৮০ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছে বলে জানিয়েছিল ইসি। কিন্তু নির্বাচনের আগের রাতে ভোট দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আনে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যথাযথ ভূমিকা নিতে পারেনি। অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট না পেয়ে ফিরে আসেন। এর সর্বশেষ গত জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঐ নির্বাচনে ভোটার ছিল ১১ কোটি ৯৬ লাখ। ভোট পড়ে ৪১ শতাংশ। বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৭ শতাংশ ভোট পড়লেও শেষ এক ঘণ্টায় ১৪ শতাংশ ভোট পড়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ফলে নির্বাচনব্যবস্থা ও ইসির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে বলেও মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকেরা। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি টানা নির্বাচন বর্জন করায় নির্বাচন হয়ে পড়েছে অনেকটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। এখন নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভোটারদের গুরুত্ব নেই, ইসি এবং প্রশাসনের কাছে সরকার দলীয় প্রার্থীই গুরুত্বপূর্ণ—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। এ কারণেও ভোটারের মধ্যে ভোটবিমুখতা তৈরি হয়েছে। ভোটার দিবস ও মোট ভোটার: এমন পরিস্থিতিতে শনিবার (২ মার্চ) জাতীয় ভোটার দিবস পালন করেছে নির্বাচন কমিশন। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সঠিক তথ্যে ভোটার হব, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলব’। দেশে ভোটার দিবসের প্রচলন শুরু হয় ২০১৯ সালে। মূলত ভোটার হতে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে এই দিবস পালন করা হয়। হালনাগাদ শেষে দেশের ভোটার বেড়ে দাঁড়াল ১২ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ১৬০ জনে। ইসির জনসংযোগ পরিচালক মো. শরিফুল আলমের মতে, ২০২৩ সালের ২ মার্চ ভোটার ছিল ১১ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ৪৪০ জন। এখন হালনাগাদ শেষে ভোটারসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ১৮ লাখ ৫০ হাজার ১৬০ জন। তিনি জানান, তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৭ জন, আর নারী ভোটার পাঁচ কোটি ৯৭ লাখ ৪ হাজার ৬৪১ জন। আর হিজড়া ভোটার ৯৩২ জন। এবার ভোটার বেড়েছে ২.২৬ শতাংশ। আস্থার সংকটের কারণ: ভোটারদের আস্থার সংকটের কারণ হিসেবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, ভোটারদের মাঝে অনাস্থা একদিনে তৈরি হয়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর প্রতিটি কমিশন বিতর্কের মুখে পড়ে। জাতীয়সহ যত স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে সমালোচনা-বিতর্ক হয়। দলীয় সরকারের অধীনে কখনোই বাংলাদেশে সুষ্ঠু ভোট সম্ভব নয়। যদিও ১৯৯১ থেকে শুরু করে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় সব নির্বাচনে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছে। এখন চিত্র ভিন্ন। ভোটাররা মনে করেন, ভোট দেওয়া না দেওয়ায় কিছু যায়-আসে না। নির্বাচনে নানা রকম কারসাজির কারণে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়।