স্টাফ রিপোর্টার :
পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে এলপিজি নিত্যপণ্য হয়ে উঠেছে। তবে অন্য নিত্যপণ্যের মতো এলপিজির দামও বাড়ছে। গত বছরের জুলাইয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ৯৯৯ টাকা। আট মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে চলতি মার্চে হয়েছে ১ হাজার ৪৮২ টাকা। অর্থাৎ সরকারিভাবেই ১২ কেজির প্রতি সিলিন্ডারে দাম বেড়েছে ৪৮৩ টাকা। ব্যবহারকারীরা জানান, পাঁচজনের একটি পরিবারে মাসে ১৫ থেকে ২০ কেজি এলপিজি লাগে। এই হিসাবে গত জুলাইয়ের তুলনায় মার্চে পরিবারপ্রতি জ্বালানি খরচ বাড়ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। যদিও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার গ্যাস পাওয়া যায় না। প্রতি সিলিন্ডার ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হয়। এলপিজির দাম নির্ধারণকারী কর্তৃপক্ষ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, বিশ্ববাজারে কাঁচামাল ও দেশে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে এলপিজির দাম বাড়ছে। বিইআরসি প্রতি মাসের শুরুতে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। চলতি মার্চের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪৮২ টাকা। গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলনে নতুন দর ঘোষণা করা হয়, যা সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে। এলপিজি মূলত প্রোপেন ও বিউটেনের একটি মিশ্রিত অনুপাত। দুটি উপাদানই আমদানি করতে হয়। সৌদি আরমাকোর ঘোষিত মূল্য (সৌদি সিপি) ধরে দেশে এলপি গ্যাসের দাম ঠিক করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান-মূল্য আমলে নিয়ে দর ঘোষণা করা হয়। দেশে ২০টি কোম্পানি এলপিজির কাঁচামাল আমদানি করে। দাম নির্ধারণে ডলারের মূল্যও ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে প্রোপেন বিউটেনকে ৩৫:৬৫ অনুপাতে মিশ্রিত করে এলপিজি তৈরি করা হয়। কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম সমকালকে বলেন, ‘জ্বালানি খাত হলো লুটপাটের আখড়া। এখানে জনগণের পকেট কেটে ব্যবসায়ীদের পকেট ভারী করা হয়। পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস দুর্লভ করে এলপিজি ব্যবসা প্রসারিত করা হয়েছে। এখন জনগণকে জিম্মি করে সেই এলপিজির দাম বারবার বাড়ানো হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও এলপিজির দাম বাড়ানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের খরচের বোঝা ভারী করছে।’ গত জুলাইয়ে ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৭৪ টাকা থেকে কমিয়ে ৯৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর থেকে প্রতি মাসে পণ্যটির দাম বাড়ছে। একই পরিমাণ এলপিজির দাম গত বছরের আগস্টে ছিল ১ হাজার ১৪৪ টাকা, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ২৮৪ টাকা, অক্টোবর ১ হাজার ৩৬৩ টাকা, নভেম্বরে ১ হাজার ৩৮১ টাকা, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৪০৪ টাকা এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ৪৩৩ টাকা ও ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৭৪ টাকা। বিইআরসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে এলপিজির কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ডলারের দামও বেড়েছে। তাই দেশে এলপিজির দাম বাড়াতে হচ্ছে। গত আগস্টে সৌদি সিপি অনুসারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম ছিল যথাক্রমে প্রতি টন ৪৭০ ও ৪৬০ ডলার। ৩৫:৬৫ অনুপাতে গড় দাম ধরা হয়েছিল ৪৬৩ ডলার। আর চলতি মার্চে দাম নির্ধারণের সময় প্রোপেন ও বিউটেনের দাম দাঁড়ায় প্রতি টন ৬৩০ ও ৬৪০ ডলার। গড় দাম হয় ৬৩৬ দশমিক ৫০ ডলার। এদিকে, গত আগস্টে এক ডলারে দাম ছিল ১১৯ দশমিক ৬৯ টাকা, ফেব্রুয়ারিতে এই দর হয় ১২০ দশমিক ৫২ টাকা, যা মার্চে আরও বাড়ে। বিইআরসির গতকালের আদেশে মার্চের জন্য রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে তরল অবস্থায় সরবরাহ করা প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১১৯ টাকা ০৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অটোগ্যাসের দাম। অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৬৭ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬৮ টাকা ০৫ পয়সা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে বছরে এলপিজির চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন।