নিজস্ব প্রতিবেদক:
পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের বাজার চড়া। সকল পণ্যের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মাংসের দোকানেও। গরুর মাংস ৭২০ টাকা থেকে বেড়ে কেজি প্রতি ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গতকাল সোমবার মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও পীরেরবাগ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। এসব বাজারে দেখা গেছে, পবিত্র রমজান উপলক্ষে গরুর মাংসের বিক্রি বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি দামও নিচ্ছেন বিক্রেতারা। তাদের মতে রমজানের কারণে হাঁটে গরুর দাম বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিতে এর প্রভাব পড়েছে। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় মাংসবিক্রেতা নয়ন বলেন, এমনি সময় আমরা ৭২০ টাকা দরে মাংস বিক্রি করি। আজ ৭৫০ টাকায় বিক্রি করছি। রমজানকে কেন্দ্র করে হাঁটে গরুর দাম বেড়ে যাওয়ায় আমরাও একটু বাড়তি দামে বিক্রি করছি। তবে এর চেয়ে কমে বিক্রি করার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। আমাদের দেশে রমজান এলেই সবকিছুই দাম বেড়ে যায় এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি বলে জানালেন মিরপুরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা শওকত আলী। তিনি বলেন, মাঝে মাংসের দাম কিছুটা কমলেও শবে বরাতের আগে থেকেই মাংস ৭৫০ টাকা করে কিনতে হচ্ছে। এখানের সিন্ডিকেট রয়েছে কোনো দোকানদার চাইলেও দাম কমিয়ে বিক্রি করতে পারে না। মাংস দাম নির্ধারণ না হওয়ার কারণে যে যার মতো করে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন। শুধু তাই নয়; এই দাম বাড়ার পেছনেও ফার্মার অ্যাসোসিয়েশন জড়িত বলেও অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম। তিনি বলেন, আমরা মাংসের দাম নির্ধারণ করতে বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। ফার্মার অ্যাসোসিয়েশনের শক্ত সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে মাংসের দাম কমছে না। দাম কমলেই তারা তাদের খামারে গরু স্টক করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এতে করে ব্যবসায়ীরা চাইলেও দাম কমাতে পারছেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে, সর্বশেষ ২০১৮ সালে মাংস ব্যবসায়ী সমিতি ও সিটি করপোরেশন মিলে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম নির্ধারণ করে ৩২০ টাকা। কিন্তু পরের বছর সমিতির বিভিন্ন সংস্কারের পরামর্শ না শুনে সরকার দাম নির্ধারণ বন্ধ করে দেয়। এক বছরেই তখন মাংসের দাম ৫০০ টাকায় উঠে যায়। পরে ২০২০ সালে মাংসের দাম গিয়ে ঠেকে ৬০০ টাকায়; ২০২১-২২ সালে ৭০০ টাকা এবং ২০২৩ সালে দাম হয় ৮০০ টাকা। অন্যদিকে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে মাংসের উৎপাদন ছিল ৮৭ লাখ টন। ওই বছর দেশের বাজারে মাংসের চাহিদা ছিল ৭৬ লাখ টন। ফলে চাহিদার তুলনায় ১১ লাখ টন বেশি মাংস উৎপাদিত হয়েছে।
বেড়েছে ইসবগুলের ভুসির দাম: রমজান এলেই বাজারে চাহিদা বাড়ে ইসবগুলের ভুসির। ইফতারে এই পানীয় দিয়ে রোজা ভাঙতে পছন্দ করেন রোজাদাররা। স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে এই পণ্যটি অনেক উপকারীও। তবে এবার রোজার আগেই প্রতিনিয়ত দাম বেড়েছে শরবতে ব্যবহৃত ইসবগুলের ভুসির। বিক্রেতারা বলছেন, গত রমজানের পর থেকেই একটু একটু করে প্রতিনিয়ত দাম বেড়েছে ইসবগুলের ভুসির। গত ৬ মাসের ব্যবধানের রাজধানীর বাজারগুলোতে শরবতে ব্যবহৃত এই পণ্যটির দাম কেজিতে প্রায় ৫০০-৬০০ টাকা বেড়েছে। দাম বাড়ার কারণ হিসেবে তারা আমদানি খরচ বৃদ্ধি, ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়ানো, ডলার সংকটে সরবরাহ ঘাটতির কথা বলছেন। গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারি, খুচরা ও ভ্যান বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। বিক্রেতারা জানান, বর্তমানে পাইকারিতে প্রতি কেজি ইসবগুলের ভুসি মানভেদে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা ৬ মাস আগে ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা ছিল। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ইসবগুলের ভুসি ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা ৬ মাস আগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা ছিল। আর রাস্তার ওপর ভ্যানে করে প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। যা মাস ছয়েক আগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হতো। ইসবগুলোর ভুসির দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ফুটপাতের বিক্রেতা কাদের বলেন, আমরা তো পাইকারি বাজার থেকে কিনে আনি। দাম বাড়ার কারণ জানি না। যতদূর শুনেছি সরকার নাকি এর ওপর ভ্যাট বাড়িয়েছে। এজন্য গত রমজানের পর থেকে দাম বাড়ছে। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের খুচরাবিক্রেতা আব্দুস সোবহানও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় ইসবগুলের ভুসির দাম বেড়েছে। এই পণ্যটি ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। ডলার সংকটে আগের মতো আমদানি না থাকায় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তার ওপর পণ্যটির ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স বাড়িয়েছে সরকার। তাই দাম বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পাইকারিবিক্রেতা শরীয়তপুর স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. আখতার বলেন, আমরা পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার থেকে ইসবগুলের ভুসি নিয়ে আসি। আমদানিকারকরা বলছেন, এর ওপর ভ্যাট-ট্যাক্স দ্বিগুণ করা হয়েছে। তাই দাম বেড়েছে। এদিকে ক্রেতারা বলছেন, রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো এখনো নিত্য ব্যাপার হয়ে গেছে। বিক্রেতারা রমজানের দুই-তিন মাস আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। যাতে কেউ বলতে না পারে, রমজানে দাম বেড়েছে। রবিউল নামের এক ক্রেতা বলেন, ইসবগুলের ভুসি তো অনেক কেনা হয় না। সামান্য সামান্য করে কেনা হয়। তাই দাম বৃদ্ধির বিষয়টি চোখে পড়ে না। কিন্তু কেজিতে কিনতে গেলে বোঝা যায় দাম কত বেড়েছে। শুধু ইসবগুলের ভুসিই না, বাজারে প্রতিটি জিনিসের দাম বেশি। কিন্তু সরকার কিছু করতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, এক সময় ব্যবসায়ীরা রমজানের আগমুহূর্তে দাম বাড়াতেন। এটি নিয়ে সবাই সরব হতো। তাই তারা এখন রমজানের ২-৩ মাস আগেই জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। আর রমজান এলে দু-এক টাকা আবার কমিয়ে দেয়। যাতে কেউ বলতে না পারে, দাম বেড়েছে। এটা ব্যবসায়ীদের নতুন কৌশল। মিতু নামের আরেক গৃহিণী বলেন, ২ মাস আগে ১৮০০ টাকা করে ইসবগুলের ভুসি কিনেছি। আজকে ২১০০ টাকা চাচ্ছে। আমরা সাধারণ মানুষ যে কীভাবে চলছি, সেটা শুধু আমরাই জানি। এক কেজির জায়গায় এখন আধাকেজি কিনি। তারপর কষ্ট হয়ে যায়।