স্টাফ রিপোর্টার:
অঙ্কন বৈধর বয়স দেড় বছর, ফুটফুটে চেহারা। এক হাতের পুরোটাই সাদা ব্যান্ডেজ করা। এক হাত দিয়ে শুয়ে মোবাইল ফোন দেখছে। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) নতুন ভবনের ৯ তলা নারী ওয়ার্ডে গিয়ে জানা যায়, অঙ্কন ভর্তি আছে বেশ কয়েক দিন। মা পপি বৈধ পাশে বসে ছেলেকে দেখছেন। গোপালগঞ্জ থেকে আসা পপি জানান, সংসারের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বাড়িতেই সরিষা ভাঙার মেশিন চলছিল। কোন ফাঁকে গিয়ে মেশিনের মধ্যে হাত দিয়ে দেয় কেউ লক্ষ করেনি। শিশুর নরম হাত মুহূর্তেই টেনে নেয় মেশিন। তারপর থ্যাঁতলে যায় হাত, আঙুলগুলো হয় ক্ষতিগ্রস্ত। চিকিৎসকরা আগামী শনিবার অপারেশন করবেন বলে জানিয়েছেন। হাতটা স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে আশঙ্কায় আছে পরিবারের সবাই—এমন দুর্ঘটনায় অঙ্গহানির আশঙ্কা নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানায় নিটোর কর্তৃপক্ষ। নিটোর-এর তথ্যমতে প্রতিদিন বহির্বিভাগে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী আসে চিকিৎসার জন্য। তাদের মধ্যে ৩০০ থেকে ৩৫০ জনই শিশু। এই শিশুদের অনেকেরই অঙ্গহানি ঘটে। অর্থাৎ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্রতিবন্ধী হচ্ছে শিশুরা। যদিও এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কোথাও নেই । তবে নিটোরের ছয় মাসের জরিপ থেকে জানান যায়—গত ছয় মাসে নিটোরে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৮০ জন প্রাপ্তবয়স্ক রোগী চিকিৎসা নেন। আর শিশুর সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৬২৭ জন। যা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি। নিটোর কর্তৃপক্ষের মতে, বহির্বিভাগের ৩৬ শতাংশ এবং জরুরি বিভাগে ২৭ শতাংশ শিশু চিকিৎসাসেবার জন্য আসে। যাদের অপারেশন প্রয়োজন হয় তাদের ৭ থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয় অর্থোপেডিক সার্জারির জন্য। সড়কের সংখ্যা বৃদ্ধি, ভ্রমণ বৃদ্ধি, বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি, খেলাধুলা, গাছ থেকে পড়া—এসব কারণে আহত হয় শিশুরা। এসব শিশুকে ৩০ শতাংশের মতো যথাসময়ে চিকিৎসকের কাছে না আনা এবং ঝাড়ফুঁক করানোর কারণে প্রতিবন্ধী হয় বলে জানান পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জমান। বগুড়ার আসাদুল্লাহর বয়স ১২ বছর, হাফিজি পড়ছে। পবিত্র কুরআনের ২৪ পারা মুখস্থ তার। গত শবেবরাতের দিন মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেয়ার সময় একটি সিএনজি তার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। ফলে তার ডান পায়ের সবগুলো আঙুল নষ্ট হওয়ার পাশপাশি পা-টা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার অপারেশন হয়েছে—এখন সে আর আগের মতো করে হাঁটতে পারবে না। একটি কৃত্রিম জুতো লাগবে হাঁটার জন্য। দেশে সাধারণ কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা আছে বলে জানান শিশু অর্থোপেডিক কনসালট্যান্ট ডা. শুভপ্রসাদ দাস। তবে উন্নত অঙ্গ প্রতিস্থাপন করে একেবারে স্বাভাবিক জীবনের পাশপাশি আসার জন্য ৫০-৬০ লাখ টাকা ব্যয় এই শিশুদের পরিবার করতে পারে না বলে জানান তিনি। প্রতিদিন নিটোরের বহির্বিভাগে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী আসে চিকিৎসার জন্য। শিশু আসে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন। এই শিশুদের মধ্যে অনেকেরই অপারেশনের প্রয়োজন হয়। যাদের অপারেশন প্রয়োজন হয় তাদের সাত থেকে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হয় অর্থোপেডিক সার্জারির জন্য। সপ্তাহে ছয়টি অপারেশন করা হলেও ২ হাজারেরও বেশি অপারেশন অপেক্ষমাণ তালিকায় আছে বলে জানান শিশু অর্থোপেডিক কনসালট্যান্ট ডা. শুভপ্রসাদ দাস। নিটোর পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জমান জানান, তাদের ১৩টি ইউনিটে ১২ হাজারের বেশি বেড আছে। তবে আলাদা করে নেই কোনো ওয়ার্ড। তাই এখানে বড়দের সঙ্গে চলে শিশুদের চিকিৎসা।