স্টাফ রিপোর্টার :
দেশের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পই শেষ হয় না নির্দিষ্ট সময়ে। তিন বছর মেয়াদ থাকলেও কোনো প্রকল্পে লাগে পাঁচ বছর, কোনোটায় সাত বছর, আবার কোনোটায় ১০ বছর। ১৫ বছর ধরে চলছে এমন প্রকল্পও আছে। এই উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে ২৮টি কারণ খুঁজে পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। প্রকল্পের শেষে ছয়টি চালেঞ্জ রয়েছে। এসব কারণে উন্নয়ন প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে প্রকল্পের কাজ। বাড়ছে মেয়াদ ও ব্যয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের এডিপির অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে আইএমইডি। সংস্থাটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রকল্প তৈরি ও অনুমোদন পর্যায়ে ১১টি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেগুলো হলো প্রকল্প তৈরিতে দুর্বলতা, দক্ষতার অভাবে অন্য প্রকল্পের ছক অনুসরণ করে নতুন প্রকল্প তৈরি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকল্প প্রস্তাবে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা লক্ষ্য অর্জনের তথ্যে অপর্যাপ্ততা এবং প্রকল্প গ্রহণে সুবিধাভোগীদের মতামত না নেওয়া। এ ছাড়া প্রকল্প তৈরির সময় রেজাল্ট ফ্রেমওয়ার্ক ও লগ ফ্রেমওয়ার্ক ঠিকভাবে না করা, প্রকল্প নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ভূমি চিহ্নিত না করা, এমটিবিএফের আর্থিক সীমা অনুসরণ না করা এবং প্রকল্পের ফলাফল টেকসই করতে পরিকল্পনা সঠিকভাবে তৈরি না করা। আরো আছে ভৌত কাজের ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়, বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত না করেই প্রকল্প অনুমোদন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের দ্বৈততা থাকে। প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ের ১১টি চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্প প্রস্তাবে দেওয়া কর্মপরিকল্পনা ও ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না করা, প্রকল্পের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা এবং তা পরিবীক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এ ছাড়া কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, নিয়মিত পিইসি ও পিএসসি সভা না করা এবং কার্যাদেশপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্যাকেজের কাজ শেষ না করে বারবার সময় বৃদ্ধির আবেদন করা। আরো আছে ইউটিলিটি স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রতা ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে জটিলতা, পিইসি ও পিএসসি সভা ছাড়াই প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে বিলম্ব ও একজন কর্মকর্তা একাধিক প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা। প্রকল্প এলাকায় পরিচালকের অবস্থান না করা এবং আইএমইডির সুপারিশ বাস্তবায়ন বা ফলোআপ না করা। প্রকল্প বাস্তবায়ন-পরবর্তী পর্যায়ের ছয়টি চ্যালেঞ্জ হলো, প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যে পিসিআর (প্রকল্প সমাপ্ত প্রতিবেদন) না দেওয়া, তুলনামূলক আর্থিক বা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ না করা এবং পিসিআর মূল্যায়ন প্রতিবেদনের ফিডব্যাক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইএমইডিকে অবহিত না করা। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত কার্যক্রম প্রকল্প শেষে পরিচালনা করার জন্য রাজস্ব বাজেটের অপ্রতুলতা, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর থেকে প্রাপ্ত ফলাফল স্থায়ী করতে কোনো ব্যবস্থা না করা এবং প্রকল্প শেষে এর যানবাহন নির্ধারিত সময়ে সরকারি পরিবহন পুলে জমা না দেওয়া। সপ্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন নির্দেশিকার হালনাগাদ সংস্করণ ২০২২ সালের জুনে প্রকাশ করা হয়েছে। ওই নির্দেশিকায় প্রকল্প তৈরির সময় বিবেচনার জন্য বিভিন্ন বিষয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে আইএমইডি প্রকল্পের বাস্তবায়ন, দীর্ঘ সময় লাগা এবং প্রাক্কলিত ব্যয় অতিক্রান্ত হওয়ার কারণসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। আইএমইডির সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমরা শুধু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেই দায়িত্ব শেষ করিনি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেসব বিষয়ও তুলে ধরেছি প্রতিবেদনে। এরই মধ্যেই প্রকল্প পরিচালক নিয়োগসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আশা করছি ভবিষ্যতে এটি আর চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে না।’ একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরেকটি অন্যতম বাধা হলো ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা। এটিও সমাধানের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে বাকি সমস্যাগুলোরও সমাধান করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন। এ বিষয়ে পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, ‘প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়ে শেষ না হওয়ার বড় সমস্যা হচ্ছে আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করায় অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। প্রকল্প বাস্তবায়নে এটা প্রথম বাধা। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, যাঁরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন, সেই প্রকল্প পরিচালকদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে, অভিজ্ঞতার অভাব রয়েছে। তৃতীয়ত, প্রকল্পে কেনাকাটার ক্ষেত্রেও তাঁদের কারিগরি জ্ঞান খুবই সীমিত। এ ছাড়া প্রকল্পগুলোতে সঠিকভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না হওয়াও দেরি হওয়ার কারণ। অনেক সময় জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণেও প্রকল্পে দেরি হয়।’