স্টাফ রিপোর্টার :
যৌন নিপীড়ন বাড়ছে শিক্ষাঙ্গনে, কর্মস্থলে কেমন আছে নারী? স্কুল-কলেজ ও কর্মস্থলে নারীকে যৌন হয়রানি থামছেই না নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন বা সহিংসতা বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। অনেক ক্ষেত্রে নীরব থাকছেন, কখনোবা প্রতিবাদে ফুঁসেও উঠছেন। তবে এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যাচ্ছে না। এতে নারীর ভীতি যেমন বাড়ছে, বিপরীতে নিপীড়করা ভেতরে ভেতরে আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। শিগগির যৌন নিপীড়নবিরোধী শক্তপোক্ত অবস্থান তৈরি করতে না পারলে এটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সারাদেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানির ঘটনা বেড়েছে। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত- কোথাও থেমে নেই হয়রানি। দেড় দশক আগে উচ্চ আদালতের এক রায়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে কমিটি গঠন হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার কার্যকারিতা রয়ে গেছে শুধু কাগজে কলমেই। নারীর প্রতি যৌন নির্যাতন ও হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা কমিটিগুলোকে কার্যকর করে তোলা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। ২০০৮ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী কর্মস্থল এবং শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য দিকনির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি রিট করেন। শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১৪ মে রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ গ্রহণের জন্য ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যা করে। এ ঘটনায় করা মামলায় প্রতিষ্ঠানটির দুই শিক্ষিকা নাজনীন ফেরদৌস ও জিনাত আক্তারের বিরুদ্ধে রায় চতুর্থ দফায় পিছিয়েছে। আগামী ৩ জুন রায়ের নতুন তারিখ ধার্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু অরিত্রী নয়- স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাপড়ুয়া এমন বহু শিক্ষার্থী রয়েছেন যারা হয়রানির শিকার। যাদের অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে একপর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাদের বিষয়ে দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার এরপর দীর্ঘ সময়েও হাইকোর্টের নির্দেশনা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। অভিযোগ আছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটি হলেও সেটি হয় একেবারেই দায়সারাভাবে, যা কার্যত অকার্যকরই থেকে যায়। এক মাসে নির্যাতনের শিকার ২৪৫ নারী-শিশু নারী নির্যাতন আগ্রাসী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে ২০০৮ সালের ওই রায়ের পরপরই বহু পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়। তবে এসময়ের মধ্যে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না, তার তথ্য সুনির্দিষ্ট করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। আবার কমিটি গঠন করা হলেও বেশিরভাগ শিক্ষার্থী- শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্টরা এ প্রতিরোধ কমিটি সম্পর্কে জানেন না। শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ছেলে শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষকরা এখন এসব ঘটনায় অভিযুক্ত হচ্ছেন। যৌন নিপীড়ন বাড়ছে শিক্ষাঙ্গনে, কর্মস্থলে কেমন আছে নারী?বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে আবার ঘটনার পরপরই স্থানীয়ভাবে যৌন হয়রানির মতো ঘটনার মীমাংসা করা হচ্ছে। কখনো কখনো দু-একটি অভিযোগ জমা পড়লেও শিক্ষা কর্মকর্তারা তদন্ত করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি থাকার কথা থাকলেও সেটি এখনো হয়নি। ২০০৯ সালের ১৪ মে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের জন্য প্রতিটি কর্মক্ষেত্র এবং প্রতিষ্ঠানে একজন নারীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছিল, কমিটির অধিকাংশ সদস্যই নারী হতে হবে। এছাড়া দেশের যে কোনো স্থানে নারী, মেয়ে ও শিশুদের যে কোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক বা যৌন হয়রানি রোধে সরকারকে নির্দেশিকা অনুযায়ী একটি আইন প্রণয়নের নির্দেশনাও দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যৌন হয়রানি ব্যাধি’, বিপন্ন অভিযোগকারীর শিক্ষাজীবন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৬ শতাংশ ছাত্রীই যৌন হয়রানির শিকার হন যৌন হয়রানির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি নিরসনে উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণা চালানো, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে লিঙ্গ বৈষম্য এবং যৌন সহিংসতা বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারেরও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি। যৌন নিপীড়ন বাড়ছে শিক্ষাঙ্গনে, কর্মস্থলে কেমন আছে নারী?কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ যৌন হয়রানির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদ্য নির্বাচিত সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন জাগো নিউজকে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। আমার কাছে মনে হয়, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে এসব ঘটছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের আলোকে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি রোধে কমিটি করলেই হবে না। কমিটি করা উচিত রায় অনুযায়ী। তবে আমি মনে করি, সবার আগে নৈতিকতার শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি এবং সুষ্ঠু সংস্কৃতির ধারা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে শুধু কমিটি করে রায় দিয়ে কিছু হবে না।