৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৪শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

মেয়েদের কণ্ঠকে সিদ্ধান্ত ও কাজে রূপ দেওয়ার আহ্বান জাহরাত আদিব চৌধুরী এমপির

admin
প্রকাশিত অক্টোবর ১, ২০২৬, ০৮:৩২ অপরাহ্ণ
মেয়েদের কণ্ঠকে সিদ্ধান্ত ও কাজে রূপ দেওয়ার আহ্বান জাহরাত আদিব চৌধুরী এমপির

এনবি ডেস্ক: ইসিএস-এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল সোসাইটি ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ঢাকার বনানীর হোটেল সারিনার রিসোত্তো হলে মেয়েদের এজেন্সি বিষয়ে একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, উন্নয়ন কর্মী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও তরুণ প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। আলোচনার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, মেয়েদের কণ্ঠ, পছন্দ ও প্রভাব রাখার সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবস্থা কী করতে পারে।

ব্যারিস্টার জাহিন মোরশেদ উপস্থিত আলোচকদের স্বাগত জানান এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসিএস-এর পথচলা নিয়ে একটি ভিডিও উপস্থাপন করেন। ভিডিওতে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সেন্টার ফর ইউনিভার্সাল এডুকেশনের সহযোগিতায় ইসিএস ফেনীতে যে “লার্নিং অ্যান্ড অ্যাকশন অ্যালায়েন্স ফর গার্লস’ এজেন্সি” (LAAGA) অ্যাকশন রিসার্চ পরিচালনা করেছে, সেটিও তুলে ধরা হয়।

আলোচনা সঞ্চালনা করেন ইসিএস-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইকিডনা গ্লোবাল স্কলার কাজী নাসরীন সিদ্দীকা। তিনি বিশ্বব্যাংকের সাবেক পরামর্শক এবং LAAGA অ্যাকশন রিসার্চের গবেষণা পরামর্শক। তিনি জানান, ফেনীতে তিন বছর ধরে মেয়েদের কেন্দ্রে রেখে অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে গবেষণা চালানো হয়েছে। সেখানে মেয়েদের গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে নয়, জ্ঞান সৃষ্টির সহযোগী ও পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েদের এজেন্সি গড়ে ওঠে পরিবার, বিদ্যালয়, সামাজিক রীতিনীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, জলবায়ু, অভিবাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে, তাই দায়িত্ব কেবল মেয়েদের ওপর চাপানো যায় না। ইসিএস-এর লক্ষ্য হলো “লাস্ট মাইল থেকে টপ ফ্লোর” পর্যন্ত একটি সেতু গড়ে তোলা, যাতে মাঠপর্যায়ের প্রমাণ নীতিনির্ধারণে পৌঁছাতে পারে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার জাহরাত আদিব চৌধুরী এমপি প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি মেয়েদের এজেন্সি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং মেয়েদের কল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। মেয়েদের এজেন্সি বিষয়ে ইসিএস-এর কার্যক্রমের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি গাজীপুরে ইসিএস পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্র “জোনাকি”-র শিশুদের প্রতি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

আলোচনায় বক্তব্য রাখেন, অধ্যাপক শেখ তাহমিনা আউয়াল, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, তিনি জাতীয় উন্নয়নের জন্য মেয়ে ও তরুণ নারীদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের আবশ্যকতা তুলে ধরেন।

সামিরা বারী, সহসভাপতি, ইসিএস এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষিকা, ইসিএস-এর বিভিন্ন প্রকল্পে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, বিশেষ করে স্টেম ও পরিবেশ স্টেম শিক্ষায় মেয়েদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে। মেয়েরা যেন নিজেদের এজেন্সি প্রয়োগ করতে পারে, সে জন্য সুশীল সমাজ সংগঠনগুলোর সুযোগ ও দায়িত্ব নিয়েও কথা বলেন।

অ্যাঞ্জেলিনা ট্যানলেট, পার্টনারশিপ অ্যান্ড ফান্ডরেইজিং প্রজেক্ট লিডার, এলপি৪ওয়াই (LP4Y), কর্মসংস্থানে উত্তরণের জন্য দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা পেলে মেয়েরা ও তরুণ নারীরা আরও ভালো করতে পারে বলে মত দেন। বাংলাদেশে এলপি৪ওয়াই এই সহায়তাই দিচ্ছে।

এ এইচ এম ইমরানুল হক, প্রধান শিক্ষক, বি.এস.এন. স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ফেনী এবং LAAGA অ্যাকশন রিসার্চের অন্যতম মূল অংশীজন, ফেনীর সামাজিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব এবং সেখানকার মেয়েদের সহনশীলতা ও সম্ভাবনার কথা বলেন। ফেনীতে “গার্লস এজেন্সি ক্লাব” চালু এবং এই গবেষণা প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পিত “গার্লস এজেন্সি কার্নিভাল” আয়োজনের ওপর জোর দেন।

শামীম আরা শেউলী, বাংলাদেশ কোঅর্ডিনেটর ও মেন্টর, ইজেএন, ইন্টারনিউজ, মেয়েদের এজেন্সি নিয়ে ইসিএস-এর অ্যাকশন রিসার্চের তথ্য ব্যাপকভাবে প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেন। প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মেয়েদের এজেন্সি নিশ্চিত করতে এই বার্তা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।

মামুন মোরশেদ, উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), তিনি গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায় শুধু মেয়েদের নয়, ছেলেদের ঝরে পড়ারও প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ সমাজে বহুবিধ ক্ষতি ডেকে আনে, যার মধ্যে রয়েছে হতাশা এবং যৌতুককে কেন্দ্র করে সহিংসতা। বর্তমান সরকার ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্যও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তৃতীয় ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে দক্ষ কর্মীরা বিদেশে ভালো কর্মসংস্থান পেতে পারেন।

প্রকৌশলী লুৎফুল বারী, উপদেষ্টা, ইসিএস এবং ইউনিলিভারের সাবেক কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, মেয়েদের সম্প্রদায়ের ভেতরে ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহায়তা জোরদার করার ওপর জোর দেন। তিনি গবেষণা উদ্যোগের প্রশংসা করেন।

রফিকুল ইসলাম জুয়েল, ভাইস প্রেসিডেন্ট, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স পিএলসি, মেয়েদের আর্থিক স্বাধীনতার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জোনাকি লার্নিং সেন্টারসহ ইসিএস-এর সব প্রকল্পের প্রতি সমর্থন জানান।

তিভা তাশা, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাংলাদেশ (আইইউবি), নারীরা যেমন মেয়েদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা করতে পারেন, তেমনি বাধাও সৃষ্টি করতে পারেন বলে মন্তব্য করেন। তাই মেয়েদের এজেন্সি ফিরিয়ে আনতে নারীদেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।

সৈয়দ আমিন সামির, হেড অব কমিউনিকেশন, নাগরিক প্রতিদিন, মেয়েদের এজেন্সির পক্ষে বক্তব্য রাখেন।

মাহবুবুর রহমান, নিউইয়র্কের একটি স্কুলের শিক্ষক, উন্নত দেশের মেয়েরা যে সুযোগ পায়, বাংলাদেশের মেয়েরা তা পায় না বলে তারা নিজেদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করতে পারে না বলে মত দেন।

তরুণ অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উক্ত আলোচনাকে মানবিক মাত্রা দেয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নারী কর্মী সুমাইয়া আদর ফ্যাসিস্ট শাসনামলে তাঁর পিতার রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, পিতার মৃত্যুর পর একা লড়াই করে পড়াশোনা শেষ করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, কিন্তু ছোট বোনকে পড়াশোনা শেষ করতে সহায়তা করতে পারেননি। সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মেয়েদের আরও শক্তিশালী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের নেত্রী তাইয়েবা তাহা বলেন, পরিবার ও সমাজের রক্তচক্ষু এবং বাল্যবিবাহের প্রবল চাপ উপেক্ষা করে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে তাঁকে বান্দরবান থেকে ঢাকায় আসার পথে অসংখ্য বাধা পেরোতে হয়েছে। এই সংগ্রামে তাঁর ভাই তাঁকে এজেন্সি প্রয়োগে সহায়তা করেছেন।

ইসিএস-এর প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ও জোনাকি লার্নিং সেন্টারের ফেসিলিটেটর মিতু আক্তার বাল্যবিবাহের প্রবল চাপ সত্ত্বেও যে মেয়েরা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সমাজ মেয়েদের তুলনা করে তাজা সবজির সঙ্গে। সকালের তাজা সবজি যেমন বেশি দামে বিক্রি হয়, তেমনি কম বয়সে বিয়ে দিলে মেয়েরাও “ভালো দাম” পায়। বিকেল হলে সবজি পচে যায়, আর যে মেয়েরা পড়াশোনা চালিয়ে যায় তারা সেই পচা সবজির মতো, তাদের ভালো পাত্র জোটে না। তিনি বলেন, “আমাদের মেয়েদের প্রতিদিন এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, এজেন্সি প্রয়োগ তো দূরের কথা।”

আলোচনা শেষে কাজী নাসরীন সিদ্দীকা বলেন, মেয়েদের এজেন্সি কোনো গন্তব্য নয়, এটি এমন পরিবেশ তৈরির একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে মেয়েরা কথা বলতে, পছন্দ করতে, অংশ নিতে, প্রভাব রাখতে ও কাজ করতে পারে। তিনি বলেন, প্রমাণ ও নীতির মধ্যকার সেতুটি তখনই কার্যকর হয়, যখন মানুষ তা পার হতে ইচ্ছুক থাকে। আলোচনার মূল অন্তর্দৃষ্টি ও কর্মপরিকল্পনা ইসিএস “নলেজ-টু-অ্যাকশন” প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নথিভুক্ত করবে।

ইসিএস-এর উপদেষ্টা নুর আলম সংহতি প্রকাশ করেন এবং ইসিএস-এর প্রকল্প সমন্বয়কারী এস এম নাহিদ উপস্থিত ছিলেন।

পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসিএস তৃণমূল পর্যায়ে শিশু, মেয়ে, শিক্ষক, পরিবার ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করছে। এই অভিজ্ঞতাকে তারা গবেষণা, জাতীয় সংলাপ ও আন্তর্জাতিক শিখন-বিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত করছে।

লার্নিং অ্যান্ড অ্যাকশন অ্যালায়েন্স ফর গার্লস’ এজেন্সি (LAAGA) ২০২২ সাল থেকে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সেন্টার ফর ইউনিভার্সাল এডুকেশনের সঙ্গে কাজ করছে। আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের গবেষক ও কর্মীদের একত্র করে এটি মেয়েদের এজেন্সি বিষয়ক জ্ঞান সহ-সৃষ্টি করে এবং তা কাজে রূপ দেয়।